[ My Blog ]

Hello, I'm Atiab Jobayer. I am a competitive programmer & UI designer with a mass experience of working on a few projects as a frontend developer. I am also a debater and web software researcher.

কংগ্রেস জয়ের গল্প

December 1, 2016 Atiab Jobayer

এই বছরের শিশু কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে আমার তৈরি করা সফটওয়্যার প্রজেক্ট CoderzWar "প্রজেক্ট অব দ্য কংগ্রেস" নির্বাচিত হয়েছে। সেটা নিয়েই আজকের কথাগুলো লেখা। চেষ্টা করব কংগ্রেস বিষয়েই লিখতে তবে অভ্যাসবশত কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা ঢুকে যেতে পারে।

গতবছর অর্থাৎ ২০১৫ সালের বিজ্ঞান জয়োৎসব ছিল আমার অংগশগ্রহণ করা প্রথম কোন বড় ধরনের বিজ্ঞান মেলা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা উপস্থাপনা করার দরূন বিভাগীয় সেরার খেতাবটাও জুটেছিল কিন্তু প্রজেক্টটাই আসলে সুবিধার না হওয়ার কারণে জাতীয় পর্যায় থেকে ফিরতে হয়েছিল খালি হাতেই। তার কিছুদিন আগে আমি অংশ নিয়েছিলাম SPSB Winter Science School এ। তিনদিনের এই অনাবাসিক ক্যাম্প আমার কাটানো অন্যতম সেরা সময়গুলোর মধ্যে একটি(ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা ব্লগ লিখেছিলাম এই সাইটেই। সাইটটা শেয়ার্ড হোস্টিং এ হোস্ট করা ছিল। একদিন দুম করে সব গায়েব। সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করেছি আর কখনো শেয়ার্ড হোস্টিং না।)।

সেখানে একটু ডিটেইলে প্রথমবারের মত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা করার আর আইডিয়া বের করার পদ্ধতি শিখেছিলাম। এর কিছুদিন পরেই বিজ্ঞান জয়োৎসব গেল। পুরষ্কার না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ ছিল একটু। তবে সেখানে অনেকগুলো প্রজেক্ট দেখেছিলাম। বলতে লজ্জা নেই ,এই আশায় যে লোকাল সায়েন্স ফেয়ারে এগুলো বানিয়ে পুরষ্কার পাওয়া যেতে পারে। যে আশায় ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম সেটা কাজে না লাগলেও অন্য একটা কাজে লেগেছিল।

একটা প্রজেক্ট দেখলাম তারা একটা সফটওয়্যার বানিয়েছে বাংলা আঞ্চলিক ভাষার ট্রান্সলেটর। সেখানে কোন আঞ্চলিক ভাষা লিখলে সেটার প্রমিত রূপটা দেখাতো। এটা দেখার পরই আমার মাথায় আসল যে কম্পিউটার সায়েন্স নামে একটা জিনিস আছে অর্থাৎ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিয়েও বিজ্ঞান এর গবেষণা করা সম্ভব! এটা আমার চিন্তার একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। কারণ হল এর আগে থেকেই আমি কম্পিউটার সায়েন্স এর এমন একটা বিষয় নিয়ে কাজ করছিলাম যেটাকে অনায়াসেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার আওতায় ফেলা যায়।

আমার টার্গেট ছিল পরের জয়োৎসব এ সেটা নিয়ে কিছু একটা করব। উইন্টার স্কুলে আমার যে কয়জন খুব ভালো বন্ধু হয়েছিল তার মধ্যে একটা হচ্ছে পালকি। একদিন আমাকে একটা ফর্ম সেন্ড করে বলল সেটা ফিল আপ করতে। সেটা ছিল বাংলাদেশের মানুষের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের উপর একটা গবেষণা। তারপর আমি জানলাম ওর কাছ থেকে যে এই গবেষণাটা ও করছে শিশু কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস এর জন্য। এই প্রতিযোগিতার নাম আমি আগে থেকেই জানতাম। তবে কেন জানি এর বাছাই পদ্ধতি আমার কাছে ভীতিকর মনে হত। আগে গবেষণাপত্র জমা দাও, সিলেক্ট হলে তারপর অংশগ্রহণ! খুব অদ্ভুত লাগত ব্যাপারটা। তবে পালকি যাচ্ছে শুনে আমার মনে হল একবার ট্রাই করে দেখা যেতে পারে। এই ঘটনা এই বছরের মার্চ-এপ্রিল এর দিকে। অর্থাৎ কংগ্রেস এর তখনো প্রায় আধা বছর বাকি।

অনেকেই জানেন যে আমি একটা অনলাইন জাজ ওয়েবসাইট এর সাথে জড়িত। সেটার প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে আমি একজন। আমি চিন্তা করলাম আমার এই জাজিং সাইটটাকেই একটা প্রজেক্ট হিসেবে উপস্থাপন করব। যেহেতু আমার লেখার দক্ষতা খুব বেশি ভালো না তাই আমি সাইটটা কিভাবে কি কাজ করে মোটামুটিভাবে লিখে পালকির কাছে দিলাম সুন্দর করে কনসেপ্ট পেপার লেখার জন্য । ও কয়েকদিন পর প্রমিত ভাষায় অতি চমৎকার একখানা কনসেপ্ট পেপার লিখে আমাকে পাঠিয়ে দিল যেটা পরবর্তীতে সামান্য পরিমার্জন করে জমা দিয়েছিলাম। বলতেই হয় যে আমার কংগ্রেস যাত্রার পিছনে এই মেয়ের ব্যাপক ভূমিকা আছে।

কয়েকমাস পর অফিসিয়ালি কংগ্রেস এর কার্যক্রম শুরু হল। ১ মাস ধরে চলল গবেষণাপত্র জমা নেয়া। আমার কনসেপ্ট পেপার আগেই রেডি করা ছিল তাই আমি শুরুতেই সেটা সাবমিট করে দিলাম। এর ৩ - ৪ দিন পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ফোনে এসএমএস এসেছে যে আমার প্রজেক্ট চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত। কি যে আনন্দ লেগেছিল!

এরপর আমি সময় পেলাম ১ মাস আমার কাজ গুছানোর জন্য। প্রকৃতপক্ষেই আমি সেই দিনগুলো অনেক পরিশ্রম করেছি। এমন দিনও গেছে যে বন্ধের দিন সকালে রিপোর্ট লেখা শুরু করেছি, পুরোদিন কোন কাজ না করে শুধু রিপোর্টই লিখেছি। আমাদের সাইটটা পিএইচপি ফ্রেমওয়ার্কে করা। যতগুলো মডেল, ভিউ, কন্ট্রোলার ছিল প্রত্যেকটা একাধিকবার পড়েছি। সাইট এর প্রত্যেকটা কাজ কোন ফাংশন দিয়ে জেনারেট হচ্ছে ফাইলের কোন লাইনে ঐ কাজের কমান্ড লেখা আছে তার সব একাধিকবার প্র্যাকটিস করেছি। লক্ষ্য ছিল একটাই, বিচারক যাতে কোন প্রশ্ন করে আটকাতে না পারে।

এখানে একটা জিনিস আমি করেছি যেটা অনেকেই জানে না। কংগ্রেসে আমি আমার প্রজেক্টটার গবেষণা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হয়েছে বললেও আসলে এই সাইটটার তৈরি করানোর সময় কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই অবলম্বন করা হয়নি। কারণটা খুব সাধারণ। যারা এর আগে সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির কোন কাজ করেছেন বা ওয়েব প্ল্যাটফর্মে কাজ করেছেন তারা বুঝবেন যে আসলে একটা সফটওয়্যার বানানোর আগে আসলে জিনিসটা কি কাজ করবে শুধু সেই ধারনা থাকে। কিভাবে কাজ করবে সে ব্যাপারেও ধারণা থাকে খুব কম। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করলাম যেকোন কাজকেই বৈজ্ঞানিক কার্যপদ্ধতির রূপ দেয়া যেতে পারে। আর এভাবেই সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরি করা সফটওয়্যারটা বানানোর পরে বৈজ্ঞানিক রূপ দিলাম আমি। যেমন আমি কাজ করার সময় দেখেছিলাম সাধারণ অনলাইন জাজের আর্টিকচার অনেক হেভি। তাই আমি অনেক ঘাটাঘাটি করে লাইট জাজিং আর্কিটেকচার বানিয়েছিলাম। এই জিনিসটাকেই আমি রিপোর্ট লেখার সময় হাইপোথিসিস পার্টে লিখেছি। অর্থাৎ একটা পিওর বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে যা যা করা লাগে তার সবই কিন্তু আসলে আমার করতে হয়েছে কাজটা করার সময়। কিন্তু আমি তখন জেনে করি নাই। ফলস্বরূপ আগের কাজটা হয়তো পরে হয়েছে কিন্তু শেষে গিয়ে সবই হয়েছে। কেউ যেন মনে না করে যে আমি কোন গবেষণা না করেই সেটা মিথ্যা কথা বলে উপস্থাপন করেছি :p ।

এভাবে যতভাবে প্রিপারেশন সম্ভব তার সবগুলোই নিলাম কংগ্রেস এর জন্য। তার পর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ২৩-২৪ সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে আয়োজন করা হল শিশু কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৬। প্রথমদিন গবেষণা উপস্থাপন পর্ব। একাধিকবার বিচারকার্য করা হল। দর্শকদের মনোভাব আসলে সব বিজ্ঞান মেলাতেই এক থাকে। ভিজুয়াল জিনিসের প্রতি তাদের আগ্রহ অসীম। আমার পাশের টেবিলে একটা প্রজেক্ট এসেছিল রোবটের। খুবই সাধারণ রোবট। অ্যাপ দিয়ে চালানো যায় এই হচ্ছে তার বিশেষত্ব। এই ধরনের রোবটের সোর্স কোড গুগলে সার্চ দিলে অনেক পাওয়া যায়। এমনকি অ্যাপের টেমপ্লেট ও পাওয়া যাবে আমার ধারণা। দর্শকদের এই ধরনের প্রজেক্টেই আগ্রহ বেশি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও এসে তাদের ইন্টার্ভিউ নিলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রথম পর্বের বিচারকাজেই তাদের প্রজেক্টটা বাদ পড়ল। তাদের মুখের অবস্থা তখন দেখার মত।

একেবারে শেষ দফার বিচারক ছিলেন অন্যরকম গ্রুপ এর চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগ। এসে আমি যেরকম আশা করেছিলাম সেইরকমই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলেন। সাধারণত শুরুতে মাপজোখ সম্পর্কিত প্রশ্ন করা হয় এই সব ক্ষেত্রে। মোটামুটি ভালো ভাবে শেষ হতে গিয়েও সুবিধা হল না। আচমকা এমন এক প্রশ্ন করলেন যেটা তখন কেবল বানানো শুরু করেছি। কাজটা আধাখেঁচড়া অবস্থায় থাকায় সেই প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বিধিবাম! যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। তারপর আর কি করা। যতটুকু করেছি সেটুকুই আমতা আমতা করে দেখালাম। প্রচণ্ড নার্ভাসনেস কাজ করছিল তখন। যাই হোক,শেষ পর্যন্ত বিচারকাজ সম্পন্ন হল। আমাকে অভিনন্দন জানালেন। এরপর আমার টেবিলেই আরেকটা নটরডেম কলেজের প্রজেক্ট ছিল সেটা জাজ করতে শুরু করলেন।

আচমকা আমার মনে পড়ল নার্ভাসনেস এর কারণে একটা জিনিস আমি দেখাতে ভুলে গিয়েছিলাম। যে কাজটা আমি অর্ধেক করে রেখেছিলাম তার একটা প্রাইমারি ডেমো পিসিতে রাখা ছিল। সেটা দেখালে সোহাগ ভাইকে সন্তষ্ট করা যেতে পারে! ধৈর্য্য ধরে ঐ প্রজেক্টের বিচারকাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর বললাম আপনি যে কাজটা দেখতে চেয়েছেন তার একটা ডেমো আমি তৈরি করেছিলাম আসলে। তারপর সেটা দেখানোর পর একটু হেসে বললেন , "কাজ তো অনেকদূর এগিয়েছে তোমার!"।

পরেরদিন রেজাল্ট এর পালা। সিনিয়র গ্রুপে প্রথম সিলেক্টেড প্রজেক্টটাই আমার ছিল। সিলেক্টেড হয়েই খুশি ছিলাম। একটু পর কামরুল ভাই ডেকে বলল, পূর্ণ একটু সামনে দাড়াও। তারপরই মুনির হাসান স্যারকে বলতে শুনলাম, "যে প্রজেক্টটা প্রজেক্ট অব দ্য কংগ্রস হয়েছে সেটা নিয়ে গত দেড় বছর ধরে কাজ চলছে। প্রজেক্টটা এসেছে অনেক দূরের জেলা বরগুনা থেকে"। এটুকু শোনার পর প্রথমবারের মত দেশসেরার খেতাব, নিজের স্কুলের নামকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আর একঝাঁক ক্যামেরার ফ্ল্যাশে যখন চোখ ধাধিয়ে যাচ্ছিল তখন সত্যিই মনে হয়েছিল "জীবন আনন্দের!" ^_^ ।